English
ডেইলি খবর
সত্যের সন্ধানে, প্রতিদিন
ব্রেকিং
বিনোদন

পেপারব্যাকের সম্রাট: রাখিব হাসান ও সেবার সোনালি যুগ

ঢাকা, ১৫ অক্টোবর: এক সময় বিকেলের পড়ন্ত আলোয়, ভাঙা খাটের কিনারায় বা জানালার পাশে হেলান দিয়ে শিশুরা ডুবে থাকত হাতের মুঠোয় ধরা ছোট্ট একটি বইয়ে। প্রচ্ছদে প্রায়ই আঁকা থাকত করোটিখানা, অন্ধকার এক বাড়ি, আর অদৃশ্য বিপদের দিকে তাকিয়ে থাকা তিনটি কিশোর মুখ। বইয়ের নিচে লেখা নামটি — রাখিব হাসান — কয়েক প্রজন্মের পাঠকের কাছে হয়ে উঠেছিল বিশ্বাসের প্রতিশব্দ।

পেপারব্যাকের সম্রাট: রাখিব হাসান ও সেবার সোনালি যুগ

সেবার সাম্রাজ্য

সেবা প্রকাশনী নামের ছোট্ট এক প্রতিষ্ঠান ওই পাতলা পাতার বইগুলোর ওপর ভর করে গড়ে তুলেছিল এক বিশাল সাম্রাজ্য। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশি শিশুর হাতে বাইরের জগৎ দেখার জানালা ছিল হাতেগোনা। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ছিল সীমিত, বিদেশভ্রমণ ছিল দূরের কল্পনা। অথচ সেবার একটি পেপারব্যাক মিলত মাত্র কয়েক টাকায় — আর তার ভেতরের সস্তা কাগজের পাতায় পাঠক খুঁজে পেত ক্যালিফোর্নিয়ার ভাঙারি খামার, স্কটল্যান্ডের কুয়াশাঘেরা দুর্গ, মরুভূমি আর ডুবে যাওয়া জাহাজ।

এই উদ্যোগের কেন্দ্রে ছিল তিন গোয়েন্দা সিরিজ। রবার্ট আর্থারের থ্রি ইনভেস্টিগেটরসকে বাংলাদেশের মাটিতে নিয়ে এলেন রাখিব হাসান — চরিত্র পেল বাঙালি নাম, পেল এদেশের স্বাদ: কিশোর পাশা, যুক্তিবাদী কৌশলী; মুসা আমান, বলিষ্ঠ দেহের ভীতু যুবক; আর রবিন মিলফোর্ড, নিখুঁত নথির রক্ষক। রকি বীচের মানচিত্র ঠিকই রইল, কিন্তু গল্পের ভাষা বদলে গেল — হাস্যরসে বাঙালি ছন্দ, বন্ধুত্বে ঢাকা-ময়মনসিংহের আড্ডার সুর।

পাঠকের বিশ্ববিদ্যালয়

এই বইগুলো নীরবে শিশুদের শিখিয়েছিল পর্যবেক্ষণ, নথিভুক্তি আর যৌক্তিক প্রশ্নের শৃঙ্খলা। তালা দেওয়া গেট, অচেনা পথচারীর এক সেকেন্ড দেরিতে হাঁটা — নিজের রাস্তাতেও অদ্ভুত কিছু খুঁজে পেতে শিখেছিল তারা।

আর বই হাতবদলের এক নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল: স্কুলের বেঞ্চ ঘুরে, ভাইবোনের মধ্যে ক্রমানুসারে, পাড়ার ছোট্ট ভাড়া-দোকানের হাতে লেখা খাতায় — সময়মতো ফেরত দাও, পাতা ভাঁজ কোরো না, শেষটা কখনো আগাম বোলো না। একটি বই হয়তো ঘুরে বেড়াত ডজনখানেক বাড়ি।

একসময় রাখিব হাসান নিজে লেখা বন্ধ করে দেন। পাঠকেরা ধীরে ধীরে টের পায় — ভেতরের আলো একই, কিন্তু রংটা যেন একটু বদলে গেছে। শোনা গেল, পরের অ্যাডভেঞ্চারগুলোর পেছনে হাত শামসুদ্দিন নওয়াব নামের এক ছদ্ম-লেখকের। কেউ কেউ একে কেলেঙ্কারি বললেন, কেউ বললেন সুরের ধারাবাহিকতাই আসল। তিন সঙ্গীর চিৎকার ছাড়াই রহস্য সমাধানের সেই ছন্দ একবার শিখে গেলে তা যেন আয়ত্তে আসে — সেটা আসল কারুকাজ, নাকি নকল, সেই রায় প্রতিটি পাঠক নিজেই দেয়, কোনো অধ্যায়ের মাঝপথে বসে।

সূত্র: ডেইলি ওয়াদা