দেশের পুলিশ বাহিনীর যানবাহন সংকট দূর করতে ৫ হাজার ৮৩০টি গাড়ি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় হবে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে এই যানবাহন কেনা হবে। প্রকল্প দুটির অনুমোদনের জন্য আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।
ছবি: ডেইলি স্টার
থানায় যানবাহনের চিত্র
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের ৬৩৯টি থানায় গড়ে দুটিরও কম যানবাহন রয়েছে। বর্তমানে থানাগুলোতে মোট ১ হাজার ২৩৭টি যানবাহন আছে, যার ৬৪ শতাংশই ১০ বছরের বেশি পুরনো। এতে নিয়মিত টহল, অপরাধ তদন্ত ও জরুরি সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি থানায় একাধিক এলাকায় একসঙ্গে টহল দিতে অন্তত চার থেকে পাঁচটি পিকআপ বা পেট্রল যানবাহন প্রয়োজন। ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজন আরও বেশি। কিন্তু অনেক থানায় মাত্র একটি-দুটি যানবাহন থাকায় কোনো অভিযানে দল পাঠালে অন্য এলাকা টহলের বাইরে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দুটি প্রকল্পের ব্যয়
দুটি প্রকল্পের মধ্যে একটিতে ৪ হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন কেনা হবে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অন্যটিতে ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যানবাহনের জন্য ব্যয় হবে ২ হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে; পুরো ব্যয় বহন করবে সরকার।
বিশেষায়িত প্রকল্পের আওতায় দাঙ্গা দমনে ব্যবহৃত যানবাহন, সব ধরনের ভূমিতে চলতে সক্ষম যান, ভ্রাম্যমাণ কমান্ড সেন্টার, ক্রাইম সিন ভ্যান এবং নদীমাতৃক এলাকায় টহলের জন্য জলযান কেনা হবে। ভ্রাম্যমাণ কমান্ড সেন্টারগুলো অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, যেখান থেকে অভিযান পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
সংকট গভীর করেছে ২০২৪-এর সহিংসতা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে ৪৫৫টি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর যানবাহন সংকট আরও তীব্র আকার নেয়। গত ৩০ মার্চ সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া বা অকেজো হয়ে যাওয়ায় টহল ও আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম ব্যাহত হয়; তবে পুলিশের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ চলছে।
প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন প্রতিস্থাপনই নয়, বাহিনীর সামগ্রিক অপারেশনাল ঘাটতি পূরণ ও বিশেষায়িত সক্ষমতা বাড়ানোই এই ক্রয়ের মূল উদ্দেশ্য। জাতীয় নির্বাচন ও বড় ধরনের ইভেন্টের সময় সারা দেশে একযোগে পুলিশি কার্যক্রম চালানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা
গত ১৫ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি উভয় প্রস্তাব পর্যালোচনা করে। কমিটি খরচের সঠিকতা, সরকারি ক্রয় বিধিমালা মেনে চলা এবং প্রকল্প শেষে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করে। পরে কমিশন একনেকের অনুমোদনের জন্য দুটি প্রকল্পই সুপারিশ করে বলে, এতে যানবাহন সংকট দূর হবে এবং পুলিশের গতিশীলতা বাড়বে।
প্রশাসনিক ৬৩৯টি থানা ছাড়াও বাংলাদেশ পুলিশের রয়েছে ২৪টি রেলওয়ে ও ৭৩টি হাইওয়ে থানা। অপারেশনাল প্রকল্পে যানবাহন মেরামতের সরঞ্জাম কেনায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া হালকা যানবাহনের ৬৫০ জন ও ভারী যানবাহনের ৩০০ জন চালককে ড্রাইভিং ও যান্ত্রিক প্রশিক্ষণ এবং আরও ৫০ জনকে মেকানিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব আছে; বিশেষায়িত প্রকল্পে ৯১০ জনকে ড্রাইভিং ও যান্ত্রিক এবং ৫০ জনকে মেকানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) কামরুন মুনীরা বলেন, এই কেনাকাটার মূল লক্ষ্য যানবাহন সংকট মেটানো ও পুলিশি কার্যক্রমে সহায়তা করা। প্রয়োজন হলে বাহিনী তাদের চাহিদা পুনর্মূল্যায়ন করে আরও অনুরোধ জমা দেবে বলেও জানান তিনি।