ডেইলি খবর
সত্যের সন্ধানে, প্রতিদিন
ঢাকা সংস্করণ
ব্রেকিং
অভিযাত্রী ইসলামি ইতিহাস জানা-অজানা

৩০ বছরে এক লাখ ২০ হাজার কিলোমিটার: ইবনে বতুতার অবিশ্বাস্য যাত্রা

১৩২৫ সালের এক গ্রীষ্মের দিন। মরক্কোর তানজিয়ার শহর থেকে একুশ বছরের এক তরুণ পায়ে হেঁটে রওনা হলেন মক্কার পথে, হজ করার ইচ্ছা নিয়ে। সঙ্গে সামান্য পুঁজি, বুকে অদম্য কৌতূহল। ত্রিশ বছর পর যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন তাঁর পেছনে পড়ে আছে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার কিলোমিটার পথ: ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ একক ভ্রমণগুলোর একটি। তিনি ইবনে বতুতা।

৩০ বছরে এক লাখ ২০ হাজার কিলোমিটার: ইবনে বতুতার অবিশ্বাস্য যাত্রা

ছবি: ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

তাঁর পুরো নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা। জন্ম ১৩০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, তানজিয়ারে, মালিকি মাজহাবের কাজি পরিবারে। ১৩২৫ সালের ১৪ জুন তিনি যাত্রা শুরু করেন। ষোল মাসের পথ পেরিয়ে ১৩২৬ সালের নভেম্বরে পৌঁছান মক্কায়, প্রথম হজ সম্পন্ন করেন।

কিন্তু মক্কাই ছিল শুরু মাত্র। মিসর, সিরিয়া, পারস্য ঘুরে তিনি পৌঁছান ভারতে। ১৩৩৩-৩৪ সালের দিকে দিল্লিতে পৌঁছালে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক তাঁকে দিল্লির প্রধান কাজি নিয়োগ করেন। প্রায় সাত-আট বছর এই পদে ছিলেন তিনি। পরে সুলতানের দূত হিসেবে চীনা সম্রাটের দরবারে যাওয়ার দায়িত্ব পান ১৩৪২ সালে। পথে দিল্লির কাছে হিন্দু বিদ্রোহীদের হামলার মুখে পড়েন, আর মালাবার উপকূলে কালিকটের কাছে জাহাজডুবিতে হারান সব সম্পদ ও সম্রাটের জন্য নেওয়া উপহার।

জাহাজডুবির পর তিনি যান মালদ্বীপে। সেখানে প্রায় দুই বছর থাকেন, এক বছর কাজির দায়িত্ব পালন করেন, শাসক পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কেও জড়ান। শ্রীলঙ্কায় ওঠেন আদম চূড়ায়। ১৩৪৫-৪৬ সালে পৌঁছান চীনের উপকূলে, কোয়ানঝো বন্দরে। চীনের ভেতরের দিকের ভ্রমণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে সতর্কতা আছে: উপকূলীয় শহরগুলোতে তাঁর উপস্থিতি মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু হাংঝো বা বেইজিং যাওয়ার দাবি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাই নিরাপদ সত্যটা হলো, তিনি চীনের উপকূলে পৌঁছেছিলেন।

১৩৪৯ সালের শেষ দিকে প্রায় চব্বিশ বছর পর তিনি তানজিয়ারে ফেরেন। ফেরার পথে সিরিয়া ও মিসরে দেখেন ব্ল্যাক ডেথ মহামারির ভয়াবহতা। কিন্তু বিশ্রাম তাঁর কপালে ছিল না। ১৩৫২ থেকে ১৩৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি সাহারা পাড়ি দিয়ে যান মালি সাম্রাজ্যে। দেখেন টিমবুকতু, নাইজার নদীর তীরের শহরগুলো, মানসা সুলায়মানের দরবার। ১৩৫৪ সালের মাঝামাঝি ফেজে ফিরে শেষ হয় তাঁর ভ্রমণ।

মারিনি সুলতান আবু ইনান ফারিসের নির্দেশে ১৩৫৫-৫৬ সালে আন্দালুসি পণ্ডিত ইবনে জুযাইয়ের কাছে তিনি মুখে মুখে বর্ণনা করেন পুরো ভ্রমণকাহিনি। এই গ্রন্থের নাম রিহলা, পুরো শিরোনাম তুহফাতুন নুজ্জার ফি গারাইবিল আমসার ওয়া আজাইবিল আসফার। অর্থাৎ শহরগুলোর বিস্ময় ও ভ্রমণের আশ্চর্য নিয়ে চিন্তাশীলদের জন্য উপহার। তাঁর মৃত্যু ১৩৬৮ বা ১৩৬৯ সালে, সঠিক সাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে।

একটা কথা মনে রাখা জরুরি। রিহলা লেখা হয়েছিল স্মৃতি থেকে, জীবনের শেষ দিকে, আর ইবনে জুযাই কিছুটা অলংকারও যোগ করেছিলেন। তাই কিছু কিছু পর্ব নিয়ে পণ্ডিতদের প্রশ্ন আছে। তবু চতুর্দশ শতকের মুসলিম বিশ্বের এমন জীবন্ত চিত্র আর কোথাও নেই: দিল্লির দরবারের ষড়যন্ত্র, মালদ্বীপের রাজনীতি, মালির বাজার, চীনের বন্দর। একজন মানুষের চোখে ধরা পড়া পুরো একটা যুগ।

সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, দ্য কনভারসেশন