ডেইলি খবর
সত্যের সন্ধানে, প্রতিদিন
ঢাকা সংস্করণ
ব্রেকিং
আরব্য রজনী জানা-অজানা

গল্প বলে প্রাণ বাঁচানো রানি: আরব্য রজনীর আসল কাহিনি

রাজ্যে তখন আতঙ্কের দিন। রাজা শাহরিয়ার প্রতি রাতে এক কুমারীকে বিয়ে করেন, আর ভোর হলেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। কাহিনি বলে, প্রথম স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষুব্ধ রাজা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, কোনো নারীকেই তিনি দ্বিতীয় ভোর দেখতে দেবেন না। রাজ্যের মেয়েরা ফুরিয়ে আসছে, উজিরের ঘরেও পড়েছে মৃত্যুর ছায়া। ঠিক তখনই নিজে থেকে এগিয়ে এলেন উজিরকন্যা শেহেরাজাদ, যার সম্বল শুধু পাণ্ডিত্য আর গল্পের ভাণ্ডার। বিয়ের রাতেই তিনি রাজাকে একটা গল্প শোনাতে শুরু করলেন।

গল্প বলে প্রাণ বাঁচানো রানি: আরব্য রজনীর আসল কাহিনি

ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

কিন্তু শেহেরাজাদের আসল অস্ত্র ছিল গল্পের শেষটা আটকে রাখা। ঠিক সবচেয়ে টানটান জায়গায় এসে তিনি থেমে যেতেন, যেন বাকিটা শুধু পরের রাতেই শোনানো যাবে। শেষটা জানার কৌতূহলে রাজা মৃত্যুদণ্ড এক দিন পিছিয়ে দিতেন। পরের রাতে সেই গল্প শেষ হতেই শুরু হতো আরেকটা, তার শেষ আবার পরের রাতের জন্য তোলা। এভাবে এক রাত, দশ রাত, শত রাত পেরিয়ে গেল পুরো এক হাজার এক রাত। এর মধ্যে শেহেরাজাদের কোলে এসেছে সন্তানও। কাহিনির শেষে রাজার মন গলেছে, বন্ধ হয়েছে হত্যার প্রথা, আর গল্পবলিয়ে মেয়েটি হয়েছেন পূর্ণমর্যাদার রানি। মনে রাখতে হবে, এটি একটি কাহিনি, ইতিহাস নয়। তবে গল্পের শক্তি যে তরবারিকেও থামিয়ে দিতে পারে, সেই ধারণাটাই এই কাহিনিকে অমর করে রেখেছে।

এক হাজার বছরে গড়ে ওঠা বই

আরব্য রজনীর সবচেয়ে অবাক করা সত্য হলো, এর কোনো একক লেখক নেই। এর শিকড় প্রাচীন পারস্যের "হাজার আফসান" নামের সংকলনে, যার অর্থ হাজার গল্প। কোনো কোনো গবেষক এর গভীরে ভারতের প্রাচীন উপকথার ছোঁয়াও খুঁজে পান। অষ্টম শতকের দিকে এই গল্পমালা আরবিতে অনূদিত হয় "আলফ লায়লা" নামে। তারপর নবম ও দশম শতকে আব্বাসীয় যুগের বাগদাদে যোগ হতে থাকে খলিফা হারুনুর রশিদের দরবার ঘিরে গড়া নানা কাহিনি। তেরো শতক থেকে সিরিয়া আর মিশরের গল্পকারেরা যোগ করেন আরও নতুন স্তর। বইয়ের নামের প্রতিশ্রুতি মেটাতে গল্পের রাতের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় পুরো এক হাজার একে। নবম শতকের একটি পাণ্ডুলিপির ছোট্ট খণ্ডাংশই এই বইয়ের সবচেয়ে পুরনো টিকে থাকা প্রমাণ।

আলাদিন আসলে ছিলই না

সবচেয়ে মজার তথ্যটা শেষে। আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ আর আলি বাবা ও চল্লিশ চোর, এই দুটি বিশ্ববিখ্যাত কাহিনি আদি আরবি পাণ্ডুলিপিতেই ছিল না। ১৭০৪ থেকে ১৭১৭ সালের মধ্যে ফরাসি পণ্ডিত আঁতোয়ান গালাঁ প্রকাশ করেন আরব্য রজনীর প্রথম ইউরোপীয় অনুবাদ। ১৭০৯ সালে প্যারিসে আসা সিরীয় গল্পকথক হানা দিয়াবের মুখে শুনে গালাঁ এই দুটি গল্প সংকলনে জুড়ে দেন। গবেষকেরা এগুলোকে বলেন "এতিম গল্প"। সিন্দাবাদের সাত সমুদ্রযাত্রার কাহিনিগুচ্ছেরও ছিল আলাদা অস্তিত্ব, মূল বইয়ে সেগুলো এসে মিশেছে আরও পরে।

এক নারীর মুখে শুরু হওয়া গল্পের এই ভাণ্ডার আজও ফুরোয়নি। সিনেমা, কার্টুন আর শিশুদের বই পেরিয়ে শেহেরাজাদ এখন বুদ্ধি আর কল্পনার প্রতীক। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে যিনি অস্ত্র করেছিলেন শুধু একটি অসমাপ্ত গল্প।