ছবি: রয়টার্স
লস অ্যাঞ্জেলেসের রানওয়েতে যখন ৫০ মিলিয়ন ডলারের হিরের ব্রা আলো ছড়াচ্ছিল, তখনই আবার সামনে এসেছে শ্রীলঙ্কার এক পোশাকশ্রমিকের মৃত্যুর প্রশ্ন। গত ১৮ অক্টোবর ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের ফ্যাশন শোয়ে কাইলি জেনার প্রথমবার রানওয়েতে হাঁটেন। তার পরনে ছিল জ্যাকব অ্যান্ড কোংয়ের তৈরি ফ্যান্টাসি ব্রা, যাতে ৪,৪১০টি প্রাকৃতিক হিরে আছে বলে জানানো হয়েছে। একই শোয়ে সন্তান জন্মের ছয় সপ্তাহ পর রানওয়েতে ফেরেন বারবারা পালভিন।
এই জাঁকজমকের বিপরীতে শ্রমিক অধিকার কর্মীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন পরমাসিভম পুষ্পলতার কথা। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার সিথাওয়াকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে ব্র্যান্ডিক্সের কারখানায় কাজ করার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সকালে তিনি মাথা ঘোরা, বুকে চাপ ও পায়ে অবশ ভাবের কথা জানিয়ে ছুটি চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে লক্ষ্য পূরণে মন দিতে বলা হয় বলে অভিযোগ। সন্ধ্যায় আভিসাওয়েলা হাসপাতালে ভর্তির পর রাতেই তার মৃত্যু হয়।
ব্র্যান্ডিক্স শ্রীলঙ্কার অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক এবং ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী। পুষ্পলতার মৃত্যুর পর শ্রমিক সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, তাকে সময়মতো চিকিৎসার জন্য যেতে দেওয়া হয়নি এবং শিফট শেষ করার পরই হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে ব্র্যান্ডিক্স ও ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট এই অভিযোগ মানেনি। ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট জানিয়েছে, নিজেদের পর্যালোচনায় সরবরাহকারীর কোনো অনিয়মের ইঙ্গিত মেলেনি এবং শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের আলাদা তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় আছে তারা। মৃত্যুর সঠিক কারণ নিয়েও ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে, তাই বিষয়টি এখনো বিতর্কিত।
এই বিতর্কের পেছনে ব্র্যান্ডটির পুরোনো ইতিহাসও আছে। নিউইয়র্ক টাইমসের ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে নারীবিদ্বেষ, হয়রানি ও ভয় দেখানোর সংস্কৃতি ছিল। তখনকার প্রধান বিপণন কর্মকর্তা এড রাজেকের বিরুদ্ধে মডেলদের চুমু খেতে চাওয়া, কোলে বসতে বলা এবং ২০১৮ সালের শোয়ের আগে এক মডেলের শরীর স্পর্শ করার অভিযোগ উঠেছিল। রাজেক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
একই সঙ্গে জেফ্রি এপস্টিনের নামও এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তিনি ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের কর্মী ছিলেন না, কিন্তু নিজেকে ব্র্যান্ডটির ট্যালেন্ট স্কাউট বলে পরিচয় দিয়ে তরুণীদের কাছে যেতেন বলে অভিযোগ আছে। ১৯৯৭ সালে এক মডেলের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশে রিপোর্ট হয়েছিল। ব্র্যান্ডের মালিক লেস ওয়েক্সনারের সঙ্গে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ আর্থিক সম্পর্ক ছিল এবং ১৯৯০-এর দশকে ওয়েক্সনারকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি শুধু একটি ফ্যাশন শোয়ের নয়। একদিকে কোটি ডলারের হিরে, পালক আর আলোর উৎসব, অন্যদিকে কারখানার লক্ষ্য, ছুটি আর সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার। শ্রমিক সংগঠনগুলো পুষ্পলতার পরিবারের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে হয়রানি ও প্রতিশোধের বিরুদ্ধে সুরক্ষা চাইছে। ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট বলছে, তারা মানবাধিকারের দায়িত্ব গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং আইন মেনে চলবে। এই দুই দাবির মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে ব্র্যান্ডটির নতুন করে ফেরা শো।
সূত্র: রয়টার্স, কাউন্টারপাঞ্চ, ফ্যাশন ইউনাইটেড