রাত নটা চৌদ্দ। শিকাগোর হাজারো ঘরে তখন চলছে ডব্লিউজিএন টেলিভিশনের রাতের সংবাদ। খেলার খবর পড়ছিলেন সাংবাদিক ড্যান রোয়ান। হঠাৎ পর্দা কালো হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর ছবি ফিরল, কিন্তু সংবাদ পাঠকের বদলে পর্দায় দেখা গেল এক মুখোশধারীকে। চোখে কালো চশমা, মুখে অদ্ভুত এক মুখোশ, পেছনে ঢেউখেলানো ধাতব প্যানেল।
ছবি: ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
ঘটনা ১৯৮৭ সালের ২২ নভেম্বর, রোববার রাতের। যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন ইতিহাসে এই রাতটি আজও সবচেয়ে রহস্যময়। অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন ব্যক্তি একই রাতে দুটি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার সংকেত হাইজ্যাক করেছিল। প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও জানা যায়নি তারা কারা, কেন এটা করেছিল।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে ডব্লিউজিএন-টিভিতে। প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ সেকেন্ড পর্দায় ছিল মুখোশধারী। কোনো শব্দ শোনা যায়নি, শুধু বিকৃত একটা গোঙানির মতো আওয়াজ। চ্যানেলটির প্রকৌশলীরা দ্রুত জন হ্যানকক সেন্টারের ওপরে থাকা স্টুডিও-ট্রান্সমিটার লিংকের ফ্রিকোয়েন্সি বদলে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান। সম্প্রচারে ফিরে ড্যান রোয়ান বলেন, আপনারা ভাবছেন কী হলো, আমিও তাই ভাবছি। তারপর রসিকতা করে বলেন, খবর চালানো কম্পিউটারটা বোধহয় পাগল হয়ে গেছে।
কিন্তু রাত তখনো বাকি ছিল। রাত সোয়া এগারোটার দিকে দ্বিতীয় হামলা হয় পিবিএস চ্যানেল ডব্লিউটিটিডব্লিউতে। তখন চলছিল ডক্টর হু ধারাবাহিকের হরর অব ফ্যাং রক পর্ব। এবার ছবির সঙ্গে বিকৃত হলেও শোনা যাচ্ছিল কণ্ঠস্বর। প্রায় নব্বই সেকেন্ড ধরে চলল এই পাইরেট সম্প্রচার। চ্যানেলের টাওয়ারে তখন কোনো প্রকৌশলী ডিউটিতে ছিলেন না, ফলে হাইজ্যাকাররা নিজেরা থামার আগ পর্যন্ত কেউ তাদের থামাতে পারেনি।
দ্বিতীয় ক্লিপটি আজও ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ায়। মুখোশধারী এতে ডব্লিউজিএনের ক্রীড়া সাংবাদিক চাক সুইরস্কিকে নিয়ে কটূক্তি করে, হাতে পেপসির ক্যান তুলে ধরে বলে ক্যাচ দ্য ওয়েভ। একটা বোনা দস্তানা পরে অভিযোগ করে দস্তানাটা নোংরা, ভাই নিয়ে গেছে জোড়াটা। শেষে চিৎকার করে বলে, ওহো, ওরা আমাকে ধরতে আসছে, থামাও এটা। ক্লিপের শেষ দৃশ্যে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গিও ছিল, যা নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা হয়।
কীভাবে সম্ভব হলো এমন হাইজ্যাক? বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা: হামলাকারীরা চ্যানেলের নিজস্ব সিগন্যালের চেয়ে শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ সংকেত পাঠিয়েছিল সম্প্রচার টাওয়ারে। এতে টাওয়ার নিজের সংকেত ছেড়ে শক্তিশালী সংকেতটি ধরে নেয়, যাকে বলে ক্যাপচার এফেক্ট। এর জন্য দরকার ছিল উচ্চ প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও ভারী যন্ত্রপাতি। ধারণা করা হয়, শহরের কেন্দ্রে দুটি উঁচু ভবনের টাওয়ারের দৃষ্টিসীমার মধ্যে কোথাও থেকে সংকেত পাঠানো হয়েছিল।
তদন্তে নামে মার্কিন ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন, এফসিসি। কিন্তু কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। কেউ কোনোদিন দায় স্বীকার করেনি। তত্ত্ব আছে অনেক: ডব্লিউজিএনের কোনো অসন্তুষ্ট সাবেক কর্মীর ভেতরের কাজ, কিংবা শিকাগোর আন্ডারগ্রাউন্ড হ্যাকারদের কাণ্ড। কিন্তু কোনোটারই প্রমাণ মেলেনি। পাঁচ বছরের মামলার মেয়াদ ১৯৯২ সালে শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন পরিচয় ফাঁস হলেও শাস্তি দেওয়ার আইনি সুযোগ নেই।
ম্যাক্স হেডরুম আসলে ছিল আশির দশকের একটি কাল্পনিক টিভি চরিত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংবাদ পাঠক। তার মুখোশ পরেই হাজির হয়েছিল হাইজ্যাকাররা। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল সম্প্রচারে যাওয়ার পর এ ধরনের হাইজ্যাক প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবু প্রশ্নটা রয়ে গেছে: সেদিন রাতে শিকাগোর আকাশে সংকেত পাঠিয়েছিল কারা? উত্তর আজও কারো জানা নেই।
সূত্র: শিকাগো ট্রিবিউন, আর্স টেকনিকা