ডেইলি খবর
সত্যের সন্ধানে, প্রতিদিন
ঢাকা সংস্করণ
ব্রেকিং
ইসলামি ইতিহাস জানা-অজানা প্রতিরোধ

মরুভূমির সিংহ: ৭৩ বছর বয়সে ফাঁসির মঞ্চে ওমর মুখতার

১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ভোর। লিবিয়ার সুলুক বন্দিশিবিরের মাঠে তোলা হলো ফাঁসির মঞ্চ। মঞ্চে উঠলেন ৭৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ, সাদা দাড়ি, চোখে প্রশান্তি। দেখতে বাধ্য করা হলো প্রায় বিশ হাজার মানুষকে, যাতে ভয় ছড়ায়। কিন্তু যাকে ভয় দেখাতে চেয়েছিল ইতালীয় ঔপনিবেশিক শাসন, সেই মানুষটিই হয়ে উঠলেন ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাবান প্রতিরোধ যোদ্ধাদের একজন। তিনি ওমর মুখতার, মরুভূমির সিংহ।

মরুভূমির সিংহ: ৭৩ বছর বয়সে ফাঁসির মঞ্চে ওমর মুখতার

ছবি: ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

তাঁর জন্ম নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে, তবে সাধারণভাবে ধরা হয় ১৮৫৮ সালে, তবরুকের কাছে জানজুর এলাকায়। ছোটবেলায় এতিম হন। জাগবুবের সেনুসি মাদ্রাসায় আট বছর পড়াশোনা করে হন কোরআনের আলেম ও ইমাম। পরে চাদ ও সিরেনাইকার সেনুসি খানকাগুলোর শায়খ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফরাসিদের বিরুদ্ধেও তিনি চাদে লড়েছিলেন।

১৯১১ সালের অক্টোবরে ইতালি লিবিয়া আক্রমণ করলে শুরু হয় প্রায় বিশ বছরের প্রতিরোধ, যার নেতৃত্বে ছিলেন এই ধর্মীয় পণ্ডিত। ১৯২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি সেনুসি বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব নেন। তাঁর কৌশল ছিল মরুভূমির গেরিলা যুদ্ধ: ছোট ছোট দ্রুতগামী দল নিয়ে ইতালীয় চৌকিতে আকস্মিক হামলা, সরবরাহ ও যোগাযোগ লাইন কেটে দেওয়া, তারপর মরুতে মিলিয়ে যাওয়া। স্থানীয় ভূগোলের জ্ঞান ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ১৯২৭ সালের মার্চে রাহেইবায় ইতালীয় সেনাদের ওপর তাঁর অতর্কিত হামলা তখনকার সংবাদে ব্যাপক আলোচিত হয়।

ইতালি দমন অভিযান জোরদার করে। ১৯৩০ সালের মার্চে সামরিক কমান্ডার হন জেনারেল রোদোলফো গ্রাৎসিয়ানি। জেবেল আখদারের প্রায় এক লাখ মানুষকে উপকূলের বন্দিশিবিরে নির্বাসন দেওয়া হয়, আর মিসর সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া তোলা হয় যাতে যোদ্ধারা সাহায্য ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতভেদ আছে: একটি হিসাবে ৪০ থেকে ৭০ হাজার, আরেকটি হিসাবে এক লাখেরও বেশি লিবীয় নিহত হন।

১৯৩১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্লোন্তার কাছে এক যুদ্ধে আহত অবস্থায় ধরা পড়েন ওমর মুখতার। বেনগাজির সামরিক আদালত তাঁকে ফাঁসির রায় দেয়, আত্মসমর্পণের প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ফাঁসির আগে তাঁর শেষ কথা ছিল পবিত্র কোরআনের আয়াত: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন (সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৬)। অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব।

মজার ব্যাপার, তাঁর শত্রু গ্রাৎসিয়ানিই নিজের বইয়ে তাঁর প্রশংসা লিখে গেছেন: মাঝারি উচ্চতা, সাদা চুল-দাড়ি, ধর্মীয় জ্ঞানে পারদর্শী, নিঃস্বার্থ ও আপসহীন, শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত ধার্মিক ও দরিদ্র।

২০০৮ সালের ৩০ আগস্ট ইতালির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বের্লুসকনি বেনগাজিতে গিয়ে ঔপনিবেশিক যুগের ক্ষতির জন্য ক্ষমা চান এবং ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে তিনি মাথা নত করেন ওমর মুখতারের ছেলের সামনে। পরের বছর রোম সফরে লিবীয় নেতা গাদ্দাফি বুকে পরেন শৃঙ্খলিত ওমর মুখতারের সেই বিখ্যাত ছবি।

আজও লিবিয়ায় তিনি শুহাদার শায়খ, শহীদদের শায়খ নামে স্মরণীয়। এক ধর্মীয় পণ্ডিত কীভাবে বিশ বছর ধরে একটি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়ে মর্যাদার মৃত্যুকে বেছে নিলেন, সেই গল্প আজও প্রতিরোধের প্রতীক।

সূত্র: কলাম্বিয়া এনসাইক্লোপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার