যুক্তরাজ্যের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মতপ্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার খর্ব করেছে বলে অভিযোগ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির নতুন প্রতিবেদন বলছে, স্লোগান দেওয়া, হাততালি দেওয়া কিংবা কেফিয়াহ পরার মতো কাজের জন্যও শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এই শাস্তির মধ্যে ছিল সাময়িক বরখাস্ত, ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, ডিগ্রি বাতিলের হুমকি এবং ভিসা বাতিলের আশঙ্কা।
ছবি: সোপা ইমেজেস
গত ২০ অক্টোবর প্রকাশিত 'সাইলেন্সিং ডিসেন্ট' শীর্ষক প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে তৈরি। এতে ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং ১৩২টি প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা পর্যালোচনা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৪০ জন সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
অ্যামনেস্টির ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা কার্যত আগাম শাস্তিতে পরিণত হয়েছে। তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়া ও ক্যাম্পাসে প্রবেশ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দৃশ্যত মুসলিম শিক্ষার্থী এবং ফিলিস্তিনি পরিচয়ের প্রতীক বহনকারীরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে কয়েকটি ঘটনা আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে। অক্সফোর্ডে ২০২৪ সালের মে মাসে শুরু হওয়া অবস্থান কর্মসূচির পর পুলিশ ডাকা এবং গ্রন্থাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনায় প্রবেশ সীমিত করার অভিযোগ উঠেছে। কেমব্রিজ ২০২৫ সালের মার্চে কিংস প্যারেডসহ কয়েকটি স্থানে প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা চেয়েছিল, যদিও সমালোচকেরা একে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে অপরাধে পরিণত করার ঝুঁকি হিসেবে দেখেছেন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ঘটনাটি সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে এসেছে। ২০২৪ সালের ৭ জুলাই সাত শিক্ষার্থী প্রায় ১৫ মিনিটের একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করেন, যেখানে তাঁরা কেফিয়াহ এবং লাল হাতের ছাপ দেওয়া টি শার্ট পরেছিলেন। এরপর তাঁদের ওপর সতর্কতামূলক ক্যাম্পাস নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যার ফলে ক্যাম্পাসে চিকিৎসাসেবা পেতে অসুবিধার কথা একজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ ইমেইলে ওই প্রতিবাদকে 'শিশুদের জেদ' এবং শিক্ষার্থীদের 'সন্ত্রাসীদের পোশাক পরা' বলে উল্লেখ করার অভিযোগও উঠেছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের শিক্ষার্থী উসামা গানেমের ঘটনাও প্রতিবেদনে আছে। ২০২৫ সালে ফিলিস্তিনপন্থি কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং মিসরে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়, যদিও সেখানে তিনি আগে আটক ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পর্যালোচনার পর তাঁর বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একা কাজ করেনি। সরকারি চাপ, শিক্ষা বিভাগের নির্দেশনা এবং নিরাপত্তা ঠিকাদারদের পরামর্শ মিলিয়ে একটি বৃহত্তর কাঠামো তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংগঠন ইউনিভার্সিটিজ ইউকে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জটিল, আর সেই ভারসাম্যের চেষ্টাই তাঁরা করেছেন। অ্যামনেস্টি বলছে, প্রতিবেদনের প্রতিটি অভিযোগ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সমানভাবে ঘটেছে, এমন দাবি করা হচ্ছে না। সংস্থাটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের 'ডিফেন্ড ডিসেন্ট চার্টার' গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্র: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল