ডেইলি খবর
সত্যের সন্ধানে, প্রতিদিন
ঢাকা সংস্করণ
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক জানা-অজানা তুর্কমেনিস্তান

নিভতে বসেছে 'নরকের দরজা': ৫০ বছরের আগুনের সত্য গল্প

তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমির মাঝখানে একটা গর্ত। ব্যাস প্রায় সত্তর মিটার, গভীরতা ত্রিশ মিটার। আর সেই গর্তের তলা থেকে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে উঠছে আগুনের শিখা। স্থানীয়রা একে ডাকে নরকের দরজা। সরকারি নাম অবশ্য অনেক কাব্যিক: কারাকুমের দ্যুতি।

নিভতে বসেছে 'নরকের দরজা': ৫০ বছরের আগুনের সত্য গল্প

ছবি: ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

এই আগুনের জন্ম নিয়ে যে গল্পটা সবাই জানে, সেটা বেশ নাটকীয়। বলা হয়, ১৯৭১ সালে সোভিয়েত ভূতত্ত্ববিদরা এখানে গ্যাসের সন্ধানে খনন চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ মাটি ধসে ড্রিলিং রিগসহ পুরো এলাকা বসে যায়, নিচে ছিল গ্যাসে ভরা এক বিশাল গহ্বর। বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রকৌশলীরা গ্যাসে আগুন ধরিয়ে দেন। ধারণা ছিল কয়েক সপ্তাহেই গ্যাস শেষ হয়ে আগুন নিভে যাবে। কিন্তু নিচের গ্যাসের ভাণ্ডার যে এত বিশাল, তা কেউ আন্দাজ করতে পারেনি।

সমস্যা হলো, এই গল্পের কোনো লিখিত প্রমাণ নেই। গবেষকরা বলছেন, সোভিয়েত আমলের নথি হয় হারিয়ে গেছে, নয়তো এখনো গোপন। তুর্কমেন ভূতত্ত্ববিদদের কেউ কেউ বলেছেন, ধসটা আসলে ষাটের দশকে হয়েছিল, আর আগুন লাগানো হয়েছিল আশির দশকে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক স্যাটেলাইট গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ল্যান্ডস্যাট তথ্য বলছে একটানা আগুন জ্বলতে শুরু করে ১৯৮৭ সালের শেষ বা ১৯৮৮ সালের শুরুতে। অর্থাৎ নরকের দরজার আসল জন্ম তারিখ আজও বিতর্কিত।

বিতর্ক যাই হোক, আগুনটা বাস্তব। গর্তের তলা ও দেয়ালজুড়ে শত শত ছোট ছোট আগুনের মুখ, যেগুলোকে জ্বালিয়ে রাখছে ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা মিথেন গ্যাস। দিনের বেলায় হয়তো তেমন চমকপ্রদ লাগে না, কিন্তু রাতের অন্ধকারে দূর থেকে দেখলে মনে হয় মরুভূমির বুক চিরে উঠছে নরকের আলো। এটাই তুর্কমেনিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণগুলোর একটি। রাজধানী আশগাবাত থেকে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার উত্তরে, কাঁচা মরুপথে চার ঘণ্টার ড্রাইভ। পর্যটকরা রাতে থাকেন পাশের ইয়র্ট তাঁবুতে, যাতে অন্ধকারে জ্বলন্ত গর্তটা দেখা যায়।

২০১৩ সালে এক অদ্ভুত কীর্তি গড়েন অভিযাত্রী জর্জ কোরুনিস। তিনিই প্রথম মানুষ যিনি নেমেছিলেন গর্তের তলায়। কেভলারের বিশেষ পোশাক আর শ্বাসযন্ত্র পরে তিনি মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের চরম পরিবেশের জীবাণু প্রকল্পের জন্য।

কিন্তু এই আগুন এখন নিভু নিভু। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গুরবাঙ্গুলি বের্দিমুহামেদভ গর্তটা নেভানোর নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্য, পরিবেশ আর গ্যাস শিল্পের ক্ষতির কথা বলেছিলেন তিনি। রাষ্ট্রীয় কোম্পানি তুর্কমেনগ্যাস গর্তের চারপাশে কয়েকটি কূপ খনন করে মিথেন ধরে ফেলার চেষ্টা করে, যাতে আগুনে পৌঁছানোর আগেই গ্যাস আটকে যায়। ২০২৫ সালের জুনে কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানান, আগুন প্রায় তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।

২০২৬ সালের মে মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইনফ্রারেড ছবিতে দেখা যাচ্ছে শিখার তাপের তীব্রতা গত তিন বছরে ৭৫ শতাংশেরও বেশি কমেছে। পরিবেশ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপটেরিওর বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে আসে। আগস্টে এএফপির সাংবাদিকরা গিয়ে দেখেন, একসময়ের দাউদাউ আগুনের বদলে এখন শুধু কয়েকটা ছোট ছোট শিখা, পোড়া কালো গর্ত। হতাশ হয়েছেন অনেক পর্যটক। তবে গবেষকদের সতর্কবাণী: শিখা কমলেও মিথেন নির্গমন কমেনি। স্যাটেলাইট তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই গর্ত থেকে বেরিয়েছে প্রায় ৭১ হাজার টন মিথেন।

নরকের দরজা তাহলে কি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? এখনো পুরোপুরি নেভেনি, কোনো আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণাও আসেনি। কিন্তু অর্ধশতাব্দীর এই আগুন যে শেষের দিকে, সেটা এখন প্রায় সবাই মানছেন। মরুভূমির যে গর্ত একদিন দুর্ঘটনায় জন্ম নিয়েছিল, সেটাই হয়ে উঠেছিল এক দেশের প্রতীক। তার নিভে যাওয়াটাও তাই একটা যুগের সমাপ্তি।

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস, এএফপি, রয়টার্স