রেস্তোরাঁর বিল হোক বা মেট্রোরেলের টিকিট, স্যানিটারি ন্যাপকিন হোক বা কম্পিউটার, পণ্য আর সেবার ওপর ভ্যাট ছাড়ের দিন শেষ হতে চলেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে একটিমাত্র ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার।
ছবি: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আইএমএফের কারিগরি কমিটির সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতিনিধি দল এই পর্যায়ভিত্তিক প্রস্তাব দিয়েছে। এনবিআরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ছাড় থাকছে না শত শত পণ্যে
বর্তমানে ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, কম্পিউটার, মেট্রোরেল সেবা, রেস্তোরাঁ, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারসহ ৫০০টিরও বেশি পণ্য-সেবায় ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াতি ভ্যাট হার প্রযোজ্য, অথবা সংবিধিবদ্ধ আদেশের (এসআরও) অধীনে পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।
নতুন পরিকল্পনায় এসব ছাড় ধাপে ধাপে তুলে নিয়ে সবকিছুকে একক ১৫ শতাংশ হারের আওতায় আনা হবে। তবে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, লবণ, মরিচের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ, গণপরিবহন, প্রাথমিক শিক্ষা, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ছাড় বহাল থাকবে।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ ভ্যাট কর্মকর্তা বলেন, "আইএমএফ আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে কীভাবে বাংলাদেশ নিজস্ব রাজস্ব বাড়াবে এবং ধীরে ধীরে কর অব্যাহতির সুবিধা থেকে সরে আসবে। আমরা কিছু অপরিহার্য খাত বাদ রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে একক ভ্যাট হার চালুর প্রস্তাব দিয়েছি।"
আইএমএফ চেয়েছিল আরও কঠোর অবস্থা
প্রস্তাব তৈরির সঙ্গে যুক্ত আরেক কর্মকর্তার ভাষ্য, আইএমএফ মূলত সব ভ্যাট সুবিধা পুরোপুরি বিলোপের পক্ষে ছিল। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষায় সুবিধা বহাল রাখার ওপর জোর দিয়েছে সরকার।
রাজস্ব সংস্কার প্রস্তাব ও দেশের আর্থিক পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে আগামী নভেম্বরে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশ, কিন্তু বেশ কয়েকটি প্রধান শর্ত পালনে পিছিয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের সংশয়
বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তাঁর মন্তব্য, "সরকার যে এবার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, আইএমএফের কাছে তার কী গ্যারান্টি আছে?"
তিনি জানান, বর্তমানে দেশে কর ছাড়ের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, অথচ প্রকৃত রাজস্ব আদায় মাত্র ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এনবিআরের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর ছাড়ের কারণে যে ভ্যাট রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে এনবিআর, তা ছিল ১ দশমিক ২৯ লাখ কোটি টাকারও বেশি।
দাম বাড়ার আশঙ্কা, আপত্তি করতে পারেন ব্যবসায়ীরা
একক হার কার্যকর হলে রেস্তোরাঁ, নন-ব্র্যান্ডের পোশাক, রড-স্টিল, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ডায়াপারসহ শত শত পণ্য-সেবার দাম বাড়তে পারে। এর আগে ২০১৫ সালে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হারের উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ড. জাহিদ হোসেনের ধারণা, নতুন প্রয়াসও একই ধরনের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।
তবে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, "একক ভ্যাট হার চালু করা অসম্ভব কিছু নয়, মূল সমস্যা হারের পরিমাণ নিয়ে। সামগ্রিক হার কিছুটা কমিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট অভিন্ন হার নির্ধারণ করা হলে ব্যবসায়ীদের আপত্তি করার বড় কারণ থাকবে না।"