মাটির প্রায় ১৫০ ফুট নিচে, মাত্র ১০ ইঞ্চি উঁচু এক পাথুরে ফাটলে উল্টো হয়ে আটকে ছিলেন জন এডওয়ার্ড জোন্স। তাঁকে বের করে আনতে ২৮ ঘণ্টা ধরে লড়েছিলেন শতাধিক উদ্ধারকর্মী। শেষ পর্যন্ত গুহাটাই হয়ে যায় তাঁর কবর। যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের নাটি পাটি গুহার এই ঘটনা ২০০৯ সালের। কিন্তু গল্পটা আজও মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়।
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় ভাই জশ আর বন্ধুদের সঙ্গে গুহায় ঢোকেন ২৬ বছর বয়সী মেডিকেল ছাত্র জন। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে গুহা ঘুরতেন দুই ভাই, অভিজ্ঞতাও কম ছিল না। সেদিন জন খুঁজছিলেন গুহার পরিচিত সরু পথ "বার্থ ক্যানাল"। কিন্তু ভুল করে তিনি ঢুকে পড়েন মানচিত্রে না থাকা অচেনা এক ফাটলে, যার নাম পরে দেওয়া হয় "ববস পুশ"। জায়গাটা মাত্র ১৮ ইঞ্চি চওড়া আর ১০ ইঞ্চি উঁচু। খাড়া বাঁকে মাথা নিচের দিকে দিয়ে ঢুকে তিনি আটকে যান, শরীরটা হয়ে যায় এল আকৃতির। না সামনে যাওয়া যায়, না পেছনে ফেরা।
২৮ ঘণ্টার লড়াই
রাতেই খবর পেয়ে পৌঁছে যান উদ্ধারকর্মীরা। একটা সময়ে পঞ্চাশের বেশি কর্মী একসঙ্গে কাজ করছিলেন সরু সুড়ঙ্গের ভেতর। দড়ি আর পুলির ব্যবস্থা বসানো হয়। এক পর্যায়ে জনকে ফাটল থেকে কিছুটা টেনে তুলতেও পেরেছিলেন তাঁরা। কিন্তু নরম পাথরের দেয়ালে বসানো পুলির একটি অ্যাংকর ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে। ধাক্কায় এক উদ্ধারকর্মীর মুখে আঘাত লাগে, আর জন আবার পিছলে চলে যান ফাটলের আরও গভীরে। ঘণ্টার পর ঘণ্টার চেষ্টা মুহূর্তে শেষ। তখনো রেডিওতে কথা বলছিলেন জন। আহত উদ্ধারকর্মীর খবর শুনে নিজের যন্ত্রণার মধ্যে তিনি জানতে চান, "সে ঠিক আছে তো? মনে হচ্ছে ও খুব আঘাত পেয়েছে।"
উল্টো অবস্থায় বেশি সময় থাকলে রক্ত মাথা থেকে শরীরে ফিরতে পারে না, হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ বাড়তেই থাকে। জনেরও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, জ্ঞান হারাচ্ছিলেন বারবার। ২৫ নভেম্বর রাতে, আটকে পড়ার প্রায় ২৮ ঘণ্টা পর, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। নাটি পাটি গুহার ইতিহাসে এটাই প্রথম মৃত্যু।
গুহাটাই হয়ে গেল কবর
মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি প্রশ্নটা: দেহটা বের করা যাবে তো? উদ্ধারকর্মীদের সাফ জবাব ছিল, যে ফাটলে জন আটকে আছেন, সেখান থেকে দেহ টেনে আনা আরও প্রাণঘাতী হতে পারে। শেষে পরিবার আর ভূমির মালিক কর্তৃপক্ষ একমত হয় কঠিন সিদ্ধান্তে। বিস্ফোরক দিয়ে গুহার ওই অংশ ধসিয়ে দেওয়া হয়, প্রবেশমুখ ভরে দেওয়া হয় কংক্রিটে। জন থেকে যান ভেতরেই, চিরদিনের জন্য। গুহার মুখে এখন বসানো আছে একটি স্মৃতিফলক, পাশে কেউ কেউ রেখে যান ফুল।
১৯৬০ সালে আবিষ্কৃত এই গুহা ছিল স্কাউট দল আর কলেজ শিক্ষার্থীদের প্রিয় জায়গা। তবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে কয়েক বছর বন্ধ ছিল এটি। ২০০৯ সালের মে মাসে আবার খুলে দেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় ঘটে এই দুর্ঘটনা। ২০১৬ সালে জনের গল্প নিয়ে তৈরি হয় চলচ্চিত্র "দ্য লাস্ট ডিসেন্ট"। আর গুহার ভেতর জন ঠিক কীভাবে আটকে ছিলেন, সেই রেখাচিত্রটি আজও মাঝে মাঝে সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়। দেখলেই বোঝা যায়, কেন এই গল্প মানুষ ভুলতে পারে না।
সূত্র: এপি