ডেইলি খবর
সত্যের সন্ধানে, প্রতিদিন
ঢাকা সংস্করণ
ব্রেকিং
ইসলামি ইতিহাস জানা-অজানা সাহাবি

ইয়ারমুকের যুদ্ধ: ছয় দিনে যেভাবে বদলে গেল লেভান্টের মানচিত্র

৬৩৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট। ইয়ারমুক নদীর তীরে ছয় দিন ধরে চলল এমন এক যুদ্ধ, যার পর লেভান্টের মানচিত্র চিরদিনের জন্য বদলে গেল। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য বাইজেন্টাইনরা হারাল সিরিয়া, আর সেই যুদ্ধের নায়ক ছিলেন একজন মানুষ, যাঁকে ইতিহাস আজও অন্যতম সেরা সেনাপতি হিসেবে পড়ে: খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)।

ইয়ারমুকের যুদ্ধ: ছয় দিনে যেভাবে বদলে গেল লেভান্টের মানচিত্র

ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

মাত্র কয়েক বছর আগেই মদিনা থেকে শুরু হওয়া মুসলিম বাহিনী সিরিয়ায় ঢুকে দামেস্ক দখল করে ফেলেছিল। এর আগেই ইরাক অভিযানে সাসানীয় বাহিনীকে হারিয়ে খালিদ এসে যোগ দিয়েছিলেন সিরিয়া ফ্রন্টে। বিপদ বুঝে বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস ৬৩৬ সালের মে মাসে বিশাল এক অভিযান পাঠালেন হারানো এলাকা ফিরিয়ে নিতে। তাঁর বাহিনীতে গ্রিক ও আর্মেনীয় সৈন্যের পাশাপাশি ছিল স্লাভ এবং খ্রিস্টান আরব মিত্ররাও। তুলনায় মুসলিম বাহিনী ছিল অনেক ছোট। সংখ্যার নির্দিষ্ট হিসাব নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতভেদ আছে, তবে প্রতিপক্ষ যে সংখ্যায় ভারী ছিল, তা নিয়ে মতভেদ কম।

খালিদ তখন নামমাত্র সর্বাধিনায়ক নন। খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাঁকে সরিয়ে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে (রা.) সর্বাধিনায়ক করেছেন, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলের দায়িত্ব ছিল খালিদেরই হাতে। তাঁর পরামর্শেই সাহসী এক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো: জয় করা শহরগুলো ছেড়ে পিছু হটে সব বাহিনীকে এক জায়গায় জড়ো করা হবে, ইয়ারমুকের গিরিখাতঘেরা সমতলে। পিছু হটার সময় যে শহরগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব আর নেওয়া যাচ্ছিল না, সেখানকার মানুষের কাছ থেকে নেওয়া জিজিয়া কর ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়। দায়িত্ব পালন করতে না পারলে কর নেওয়াও ঠিক নয়, এই ছিল যুক্তি।

ছয় দিনের লড়াই

১৫ থেকে ২০ আগস্ট চলল পর্যায়ক্রমিক লড়াই। খালিদ তাঁর দ্রুতগতির অশ্বারোহী বাহিনীকে রিজার্ভে রেখে প্রতিদিনের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেললেন। চারদিকে খাড়া গিরিখাত, পিছু হটার পথ সীমিত, এই ভূগোলই হয়ে উঠল তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। শেষ দিনে বাইজেন্টাইন বাহিনী ভেঙে পড়ল, আর গিরিখাতের মুখে মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল সম্রাটের বিশাল সেনাদল। হেরাক্লিয়াস আন্তাকিয়া থেকে পুরো অভিযান তদারক করছিলেন, কিন্তু ফল বদলাতে পারলেন না।

ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। সিরিয়ায় প্রায় সাতশো বছরের রোমান বাইজেন্টাইন শাসনের অবসান ঘটল, পুরো লেভান্ট এল রাশিদুন খিলাফতের অধীনে, আর দুই বছরের মধ্যে জেরুজালেমও মুসলিম শাসনের অংশ হলো। মুতা যুদ্ধের পর নবী করিম (সা.) খালিদকে যে "সাইফুল্লাহ" বা আল্লাহর তরবারি উপাধি দিয়েছিলেন, ইয়ারমুক সেই উপাধির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে রইল।

সামরিক ইতিহাসে ইয়ারমুককে আজও অন্যতম নির্ণায়ক যুদ্ধ হিসেবে পড়ানো হয়। কারণ এটা শুধু একটা যুদ্ধ জেতা ছিল না, এটা ছিল একটি সাম্রাজ্যের বিদায় আর নতুন এক যুগের শুরু।