প্যারিস চুক্তির সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা এবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিল। বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখার আর কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বুধবার প্রকাশিত জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) বার্ষিক এমিশন গ্যাপ রিপোর্টে সাফ বলা হয়েছে, দেশগুলো তাদের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি পূরণ করলেও চলতি শতকের শেষে তাপমাত্রা বাড়বে ২.৬ ডিগ্রি।
ছবি: এএফপি
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেশ প্রতিবেদনটির উদ্বোধনী বিবৃতিতে বলেন, "বিশ্ব আর ১.৫ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম করা এড়াতে পারবে না, আর এর পরিণতি ইতিমধ্যেই ধ্বংসাত্মক।" তিনি উল্লেখ করেন, "প্রাণঘাতী বন্যা, নির্মম তাপপ্রবাহ, ভয়াবহ দাবানল, প্রাণহানি, পঙ্গু অর্থনীতি, গভীরতর বৈষম্য। আর যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই সবার আগে ও সবচেয়ে বেশি ভুগছে।"
বর্তমান নীতিতে ২.৮ ডিগ্রির পথে
প্রতিবেদন বলছে, শুধু বর্তমান নীতিমালা চালু থাকলে উষ্ণতা পৌঁছাবে ২.৮ ডিগ্রিতে। বিশ্ব ইতিমধ্যে প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ১.৪ ডিগ্রি উষ্ণ হয়ে গেছে, এবং ১.৫ ডিগ্রি অতিক্রম করা এখন মাত্র কয়েক বছরের ব্যাপার। বিজ্ঞানীদের সতর্কবাণী, ১.৫ ডিগ্রির ওপরে প্রতিটি ভগ্নাংশ ডিগ্রি বাড়াবে চরম আবহাওয়ার ঘটনা, মরতে থাকা প্রবালপ্রাচীর থেকে গলতে থাকা চিরহিমায়িত ভূমি পর্যন্ত অপরিবর্তনীয় পরিবর্তনের ঝুঁকি।
এবারের পূর্বাভাস গত বছরের চেয়ে খারাপ হওয়ার পেছনে দুটি কারণ চিহ্নিত করেছেন প্রতিবেদনের সহ-লেখক অ্যান ওলহফ: প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহার এবং ঐতিহাসিক নির্গমনের তথ্যের ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন। ২০২৫ সালে বিশ্বের ছয় শীর্ষ নির্গমনকারীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া ও চীনে নির্গমন বেড়েছে; কমেছে ভারত, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে। তবে মাত্রার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ কোটি ৩০ লাখ টন সিও২ সমতুল্য বৃদ্ধি অন্য যেকোনো দেশকে "বহুগুণে ছাড়িয়ে" গেছে, যার পেছনে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুনরুত্থান। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃদ্ধি তুরস্কে, যে দেশ ৯ থেকে ২০ নভেম্বর আন্তালিয়ায় কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজন করছে।
নেতৃত্বের ঐতিহাসিক ব্যর্থতা
কেনিয়াভিত্তিক থিংকট্যাংক পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহাম্মদ আদো বলেন, "এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঐতিহাসিক ব্যর্থতা। বিজ্ঞান কয়েক দশক ধরে স্পষ্ট, কিন্তু সরকারগুলো পদক্ষেপের বদলে বিলম্ব বেছে নিয়েছে। এর পরিণতি মাপা হবে হারানো প্রাণ দিয়ে, শুধু ডিগ্রি দিয়ে নয়।" গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউট ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের সিইও বিল হেয়ারের ভাষায়, "মূল বার্তা সহজ: সরকারগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর নীতি কার্যকর করতে হবে।"
প্রতিবেদনে একটি দৃশ্যপটও তুলে ধরা হয়েছে যেখানে ২১০০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ সম্ভাবনায় উষ্ণতা আবার ১.৫ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনা যায়। তবে সেজন্য ২০৫০ সালের মধ্যে উষ্ণতা সর্বোচ্চ ১.৮ ডিগ্রিতে পৌঁছে থামতে হবে এবং বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড সরাতে হবে। আর তা চায় প্রতি বছর ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ৬ শতাংশ হারে অবিলম্বে নির্গমন কমানো, যা বর্তমান পূর্বাভাসের ধারেকাছেও নেই। গুতেরেশ অবশ্য হাল ছাড়তে নারাজ: ১.৫ ডিগ্রি অতিক্রম "আত্মসমর্পণ নয়", তবে তিনি স্বীকার করেছেন জলবায়ু "নেতৃত্বের ঘাটতি" রয়েছে।
সূত্র: এএফপি