ঢাকা, ১৮ অক্টোবর: আয় বাড়ছে না, কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ প্রতিদিন লাফিয়ে বাড়ছে—এই টানাপোড়েনে দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার এখন ঋণগ্রস্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক বিশেষ জরিপে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গত এক বছরে দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণ করতে বাধ্য হয়েছে।
ছবি: দ্য ডেলটা লেন্স
জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে বিবিএসের 'দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল' পরিচালিত 'লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫'-এ উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের এই কঠিন জীবনসংগ্রামের চিত্র। গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে গ্রাম, শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকার মোট তিন হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়; ১৫০টি নমুনা এলাকা থেকে ট্যাবলেট ডিভাইস ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গ্রামে চাপ সবচেয়ে বেশি
জরিপ বলছে, গত এক বছরে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছে। একই সময়ে শহরাঞ্চলের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ পরিবার ধারদেনার দ্বারস্থ হয়েছে। অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামের পরিবারগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি
হিসাবটি সহজ—মানুষের পকেটে যা ঢুকছে, তার চেয়ে বেশি বেরিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা, যেখানে গড় মাসিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩১১ টাকায়।
খরচের চাপ সবচেয়ে বেশি সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে, যেখানে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। এরপর আছে শহরাঞ্চল—গড়ে ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা, এবং গ্রাম—৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।
ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে মোট খরচের অর্ধেক চলে যায় শুধু খাবার কিনতে; বাকি অর্ধেক ব্যয় হয় যাতায়াত, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো খাদ্যবহির্ভূত খাতে। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় মাসিক খরচের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যয় হয় খাদ্যবহির্ভূত নাগরিক প্রয়োজনে।
মূল্যস্ফীতির চাপে ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয়
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত চার বছর ধরে চলা টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে অনেকটাই ক্ষয় করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল।
তুলনায় ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে দেখা গিয়েছিল, জাতীয় পর্যায়ে গড় পারিবারিক মাসিক আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং গড় ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা—অর্থাৎ তখন পরিবারগুলোর সামান্য হলেও উদ্বৃত্ত সঞ্চয় থাকত, যা এখন বড় অঙ্কের ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, মহামারি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যে দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই জরিপের ফলাফল যেন তারই প্রতিচ্ছবি।