সমুদ্রের অগভীর পানিতে এখন আবার ঘুরে বেড়ায় বাচ্চা হাঙরের ঝাঁক। গত সেপ্টেম্বরে থাইল্যান্ডের জাতীয় উদ্যান বিভাগের জরিপে এক দিনে ২৭৮টি পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্ল্যাকটিপ রিফ হাঙর গোনা হয়েছে এই উপসাগরে, যা এ বছরের সর্বোচ্চ। অথচ কয়েক বছর আগেও এই জায়গাটার নাম ছিল মৃত্যুর মুখে থাকা স্বর্গ। থাইল্যান্ডের কো ফি ফি লে দ্বীপের মায়া বে, বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত সৈকত। আর এর বিখ্যাত হওয়াটাই ছিল এর সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
২০০০ সালে মুক্তি পায় লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর চলচ্চিত্র "দ্য বিচ"। ছবির মূল দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল এই উপসাগরেই। তারপর যা হলো, তা সিনেমার চিত্রনাট্যকারও ভাবেননি। লুকানো স্বর্গের খোঁজে পর্যটকদের ঢল নামে মায়া বে-তে। ২০০৮ সালে যেখানে দিনে আসতেন গড়ে ১৭০ জন, ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলে দিনে প্রায় ৫ হাজার। নৌকার নোঙর, আবর্জনা আর ভিড়ের চাপে ধ্বংস হয়ে যায় উপসাগরের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রবাল। হাঙরসহ সামুদ্রিক প্রাণীরা ছেড়ে যায় জায়গাটা।
চার বছরের নীরবতা
২০১৮ সালের জুনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় থাই কর্তৃপক্ষ: বন্ধ করে দেওয়া হয় মায়া বে। শুরুতে কথা ছিল চার মাসের, কিন্তু প্রকৃতির সেরে উঠতে সময় লাগে বেশি। শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকে প্রায় সাড়ে তিন বছর। মানুষের পা পড়া বন্ধ হতেই বদলে যেতে থাকে দৃশ্য। পানি হয় স্বচ্ছ, প্রবাল গজাতে শুরু করে, আর ফিরে আসে ব্ল্যাকটিপ হাঙরেরা, যাদের প্রজনন ক্ষেত্র এই অগভীর উপকূল। পর্যটন কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছিলেন, "হাঙর ফিরে এসেছে, প্রবাল আবার বাড়ছে, পানি পরিষ্কার হয়ে গেছে। প্রকৃতিকে সময় দিলে সে নিজেই সেরে ওঠে।"
এখন নিয়ম একদম অন্যরকম
২০২২ সালের জানুয়ারিতে আবার খোলে মায়া বে, তবে আগের সেই স্বাধীনতা আর নেই। একবারে সৈকতে থাকতে পারেন সর্বোচ্চ ৩৭৫ জন। সাঁতার পুরোপুরি নিষেধ, পানিতে নামা যায় হাঁটু পর্যন্ত। নৌকা উপসাগরে ঢুকতেই পারে না, যাত্রীদের নামতে হয় দ্বীপের উল্টো পাশের ঘাটে, তারপর কাঠের পথ ধরে হেঁটে আসতে হয় সৈকতে। প্রতি বছর আগস্ট আর সেপ্টেম্বর, প্রজনন মৌসুমে, দুই মাসের জন্য আবার বন্ধ থাকে জায়গাটা। এই মৌসুমি বন্ধের পর ১ অক্টোবর আবার খুলেছে মায়া বে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবালের পুরোপুরি ফিরে আসতে লেগে যেতে পারে আরও কয়েক দশক। মায়া বে-র গল্পটা তাই শুধু একটা সৈকতের নয়। এটা সেই প্রশ্নেরও গল্প, পৃথিবীর সুন্দর জায়গাগুলোকে ভালোবাসতে গিয়ে আমরা কি সেগুলোকে মেরে ফেলছি না তো?
সূত্র: বিবিসি