উমাইয়া খলিফাদের লম্বা তালিকায় তাঁর নামটা আলাদা করে উচ্চারিত হয়। শাসনকাল মাত্র দুই বছর পাঁচ মাসেরও কম, অথচ বহু মুসলিম পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক তাঁকে গণ্য করেন চার খলিফায়ে রাশেদের পরের স্থানে, "পঞ্চম খলিফা" হিসেবে। তিনি ওমর বিন আবদুল আজিজ, যাঁকে দ্বিতীয় ওমরও বলা হয়।
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
আনুমানিক ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মদিনায় তাঁর জন্ম। মা লায়লা বিনতে আসিমের সূত্রে তিনি দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) বংশধর। ছোটবেলা থেকেই পরিচিত ছিলেন ধর্মপরায়ণতা আর জ্ঞানচর্চার জন্য। ৭০৬ থেকে ৭১২ সাল পর্যন্ত হেজাজের গভর্নর থাকাকালীনই তিনি ন্যায়ী শাসক হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। ৭১৭ সালের সেপ্টেম্বরে চাচাতো ভাই খলিফা সুলায়মান মৃত্যুশয্যায় তাঁকেই উত্তরসূরি ঘোষণা করেন। ক্ষমতা হাতে পেয়েই তিনি ধরে বসলেন সবচেয়ে অসুবিধাজনক জায়গাটায়: রাষ্ট্রের টাকাপয়সা আর কর ব্যবস্থা।
যে সংস্কারগুলো তাঁকে অমর করেছে
তখনকার বড় অভিযোগ ছিল, আরবের বাইরের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেও তাঁদের কাছ থেকে আগের মতোই জিজিয়া কর আদায় করা হতো। ওমর এই প্রথা বন্ধ করে দিলেন। ধর্ম বদলালেই করের বোঝা আর থাকল না, আরব ও অনারব মুসলিমের আর্থিক অধিকার হলো সমান। রাজস্ব কমার ভয় তখন অনেকের ছিল, কিন্তু তিনি নীতিটাই বদলে দিলেন।
কোষাগারের শৃঙ্খলাতেও তিনি ছিলেন কঠোর। অসৎ ও অজনপ্রিয় গভর্নরদের একের পর এক সরিয়ে দিলেন। প্রভাবশালী সেনাপতি ও গভর্নর ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লাব অভিযানের লুণ্ঠিত সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ায় তাঁকে কারাগারেও পাঠালেন। শাসক পরিবারের লোকজনের রাষ্ট্রীয় জমি ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলার চলও তিনি রুখে দিলেন।
সবচেয়ে প্রতীকী সিদ্ধান্তটা ছিল ফাদাক নিয়ে। মরূদ্যানটি উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁর নিজের হাতেই এসেছিল, অথচ তিনি প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে তা ফিরিয়ে দিলেন এর আগের রাষ্ট্রীয় অবস্থায়। ঐতিহাসিক বর্ণনায় একে ফাতেমা (রা.)-এর বংশধরদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জুমার খুতবায় আলি (রা.)-কে গালিগালাজ করার প্রচলিত রীতি তিনি বন্ধ করে দিলেন, তার জায়গায় পড়ার নির্দেশ দিলেন কুরআনের সেই আয়াত: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়দের দান করার নির্দেশ দেন" (সুরা নাহল, আয়াত ৯০)। ঐতিহাসিকদের বর্ণনায়, হাদিস হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রথম আনুষ্ঠানিক হাদিস সংকলনের উদ্যোগও নেওয়া হয় তাঁর নির্দেশে। বিদেশ নীতিতেও তিনি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ থামিয়ে কনস্টান্টিনোপলের ব্যয়বহুল অবরোধ তুলে নেন।
৭২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ার দাইর সিমআন এলাকায় মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু মৃত্যুর পরেও টিকে গেল তাঁর খ্যাতি। উমাইয়াদের পতনের পর আব্বাসিরা বংশের বাকি সবার স্মৃতি মুছে ফেললেও একমাত্র তাঁর সম্মান তারা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। মাত্র আড়াই বছরেরও কম সময়ে ন্যায় আর সংযম দিয়ে একজন শাসক কতটা বদলে দিতে পারেন, ওমর বিন আবদুল আজিজ আজও তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।